সোমবার এ বিষয়ে জয়পুরহাট জেলা প্রশাসক বরাবর পৃথক লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন জয়পুরহাট সিদ্দিকীয়া কামিল মডেল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ আব্দুল মতিন এবং কয়েকজন দাখিল পরীক্ষার্থী।
লিখিত অভিযোগ ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত ১৭ মে অনুষ্ঠিত রসায়ন বিষয়ের পরীক্ষার বহুনির্বাচনী অংশ শুরুর আগে হানাইল কেন্দ্রের কেন্দ্র সচিব ও মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মুহাম্মদ আব্দুল হাকিম হঠাৎ ১০ নম্বর কক্ষে প্রবেশ করেন। পরে জয়পুরহাট সিদ্দিকীয়া কামিল মডেল মাদ্রাসা ছাড়া অন্য সব মাদ্রাসার পরীক্ষার্থীদের ওই কক্ষ থেকে বের করে দ্বিতীয় তলায় পাঠানো হয়। এরপর দ্বিতীয় তলা থেকে সিদ্দিকীয়া মাদ্রাসার ছাত্রীদের নিচে এনে একই কক্ষে ছাত্রদের পাশে বসিয়ে পরীক্ষা নেওয়া হয়।
অভিযোগে বলা হয়, দাখিল পরীক্ষা পরিচালনা নীতিমালা-২০২৬ এর ৪.৬.৪ ধারা অনুযায়ী একই প্রতিষ্ঠানের পরীক্ষার্থীদের পাশাপাশি আসন বিন্যাস সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কিন্তু একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের একত্রে বসিয়ে পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে, যা পরীক্ষার শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
পরীক্ষার্থীদের অভিযোগ, অন্যান্য মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন ধরনের বিশেষ সুবিধা দেওয়া হলেও সিদ্দিকীয়া মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে কঠোরতা ও বৈষম্যমূলক আচরণ করা হয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়, হানাইল মাদ্রাসায় একটি ‘গোপন কক্ষ’ ছিল, যেখানে বিভিন্ন মাদ্রাসার শিক্ষক ও সুপাররা অবস্থান করে প্রশ্নপত্রের উত্তর বা সমাধান প্রস্তুত করতেন এবং তা নির্দিষ্ট শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হতো।
এ ছাড়া পরীক্ষাকক্ষে অতিরিক্ত নজরদারির জন্য তিনজন শিক্ষককে দায়িত্ব দেওয়া হয়। পরে মাওলানা বেলায়েত হোসেন সেখানে প্রবেশ করলে দায়িত্বরত শিক্ষকরা তাকে বলেন, “এখানে আপনাদের ছাত্র-ছাত্রী নেই, অন্য রুমে গিয়ে দিয়ে আসেন। এখানে শুধু সিদ্দিকীয়া।” এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। বিষয়টি কেন্দ্র সচিবকে জানানো হলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
খবর পেয়ে দায়িত্বরত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মাহবুবুর রহমান ঘটনাস্থলে যান। পরে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) জেসমিন নাহার কেন্দ্র পরিদর্শন করেন। এ সময় চার শিক্ষার্থীকে বহিষ্কার করা হয়।
লিখিত অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়, বহুনির্বাচনী পরীক্ষার সময় প্রায়ই বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ রাখা হতো এবং সেই সুযোগে প্রশ্নের সমাধান সরবরাহ করা হতো। এমনকি কিছু সময় সিসিটিভি ক্যামেরাও বন্ধ রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
পরীক্ষার্থীদের দাবি, দায়িত্বপ্রাপ্ত ম্যাজিস্ট্রেট কেন্দ্রে পৌঁছাতে দেরি করলে নির্ধারিত কিছু কক্ষে বিশেষ ব্যবস্থায় প্রশ্ন সমাধান করা হতো। এমনকি কিছু পরীক্ষার্থীকে সিসিটিভি ক্যামেরার আওতার বাইরে কক্ষে পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়, পরীক্ষার্থীদের এডমিট কার্ড জমা নিয়ে পাস করিয়ে দেওয়ার আশ্বাসে হানাইল মাদ্রাসায় আলিম শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ার জন্য চাপ প্রয়োগ করা হতো। ফল প্রকাশের পর শিক্ষার্থীদের অজান্তেই তাদের এডমিট কার্ডের তথ্য ব্যবহার করে অনলাইনে আলিম ভর্তির আবেদন সম্পন্ন করা হতো, যাতে তারা অন্য প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে না পারে।
এ ছাড়া পরীক্ষা পরিচালনার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসনের এক বৈঠকে সংশ্লিষ্ট মাদ্রাসার শিক্ষকরা কেন্দ্রে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না বলে সিদ্ধান্ত হলেও তা মানা হয়নি বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। বরং কিছু শিক্ষক খণ্ডকালীন ও সার্বক্ষণিকভাবে কেন্দ্রে অবস্থান করেছেন।
অভিযোগকারী অধ্যক্ষ আব্দুল মতিন বলেন, “একটি নির্দিষ্ট দিনে ও নির্দিষ্ট বিষয়ে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আসন বিন্যাস পরিবর্তন করা সুস্পষ্ট অনিয়ম। আমরা ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত চাই।”
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে কেন্দ্র সচিব মুহাম্মদ আব্দুল হাকিম বলেন, “কেন্দ্রে বহিরাগতদের মাধ্যমে নকল সরবরাহসহ সব অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট। কঠোর শৃঙ্খলা বজায় রাখার কারণে একটি মহল পরিকল্পিতভাবে কেন্দ্রটির সুনাম ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা করছে।”
জয়পুরহাটের জেলা প্রশাসক মো. আল-মামুন মিয়া বলেন, লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত সাপেক্ষে বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।